শ্রুতিনাটকঃ আয়না
অমিত বন্দ্যোপাধ্যায়
[দৃশ্য ১]
[হাসপাতালের কোনো এক রুমের কোনো এক বেড-এ শুয়ে আছেন
কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট-এ আক্রান্ত হওয়া নির্মলাদেবী, বয়স ওই ষাটের ওপার আর তার পাশে
তার হাত ধরে বসে আছেন তার স্বামি অনুব্রতবাবু, বয়স সত্তর ছুঁই ছুঁই। এছাড়া সেই
রুমে উপস্থিত নার্স নীলা]
নির্মলাদেবী: তো...তোমার সকাল থেকে খাওয়া
হয়েছে?
অনুব্রতবাবু: উফ, আবার এসব নিয়ে পড়লে
কেন! তুমি-তুমি বিশ্রাম নাও। এসব নিয়ে ভেবো না।
নির্মলাদেবী: বিশ্রামই তো নিচ্ছি গত
প্রায় এক সপ্তাহ ধরে...
অনুব্রতবাবু: ঠিক আছে...আর একটু বিশ্রাম
নাও...দেখবে- দেখবে-
নির্মলাদেবী: কি? সেরে যাব?
অনুব্রতবাবু: হ্যাঁ।
নির্মলাদেবী: হা হা হা...
অনুব্রতবাবু: যাঃ এতে হাসির কি হলো!
নির্মলাদেবী: বা রে!...হাসবো না! তু-তুমি
কি আমায়...বাচ্চা ভেবেছো?
অনুব্রতবাবু: মানে!
নির্মলাদেবী: আ-আ-আমি জানি...
অনুব্রতবাবু: চুপ করে গেলে কেন?বল কি
জানো?
নির্মলাদেবী: আমি মরে যাব...
অনুব্রতবাবু: খবরদার এইসব কথা বলবে
না...এ দেশের নামকরা ডাক্তার দেবারতি সেন তোমায় দেখছেন...কি-কিচ্ছু হবে না তোমার।
নির্মলাদেবী: ভয় পাচ্ছ?
নির্মলাদেবী: কি হলো চুপ করে আছো যে...
বল...
অনুব্রতবাবু: হু...
নির্মলাদেবী: আমি চলে গেলে তুমি কাঁদবে?
অনুব্রতবাবু: আমার হাসি- কান্না- দুটোই
তো তুমি... তাই তোমার সাথে সাথে কান্না, হাসি দুটোই চলে যাবে... তুমি কি চাও
জীবন্ত পাথর করে যেতে আমায়?
নির্মলাদেবী: আমার হাতে আছে সেটা? নেই
তো...
অনুব্রতবাবু: (দীর্ঘঃশ্বাস)আচ্ছা...এসব
বাদ দাও দেখি এখন... তুমি বরং একটু ঘুমিয়ে নাও...
নির্মলাদেবী: হে হে... তবে একটু মাথায়
হাত বুলিয়ে দাও...
অনুব্রতবাবু: এসো-
নির্মলাদেবী: ...মনে পড়ে... বিয়ের পর যখন
ছাদে বৃষ্টিতে ভিজে আমার ধুম জ্বর এলো, তুমি- তুমি ঠিক এই ভাবেই আমার মাথায় হাত বুলিয়ে
দিয়েছিলে... অফিস গেলে না সেদিন... কত করে বললাম-
অনুব্রতবাবু: কি কত করে বললাম! পাগল আমি!
তুমি জ্বরে কষ্ট পাচ্ছো আর আমি অফিসে যাব... কেউ দেখার নেই তখন... মা বাবা
হরিদ্বার গেছেন...
নির্মলাদেবী: বাব্বাঃ কত ভালবাসা নতুন
বউয়ের জন্যে!
[ রুমের দরজায় টোকা পড়ল]
ডঃ সেন: ভিতরে আসছি একটু...
আনুব্রতবাবু: আসুন আসুন দিদিভাই...
ডঃ সেন: আরে বাবা... কতবার বললাম আমায় তুমি করে বলুন মেসোমশাই...আমি অনেক ছোটো তো...
অনুব্রতবাবু: আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে...
আসলে তুমি এত ভাল ডাক্তার হয়েছো... ও কে যে অবস্থা থেকে বাঁচালে... শ্রদ্ধায়
‘আপনি’ টা এসেই যায়।
ডঃ সেন: সবই ভগবানের ইচ্ছে... আর বিপদ এখনও পুরোপুরি না কাটলেউ অবস্থা উন্নতির
দিকে... যাইহোক, দেখি মাসিমা মুখটা খুলুন, এই ওষুধটা খেয়ে নিন...
নির্মলাদেবী:...অ্যা! কেমন কেমন স্বাদ...
ডঃ সেন: ঠিক আছে আপনি এখন একটু ঘুমান, আর নীলা-
নীলা: হ্যাঁ ম্যাডাম...
ডঃ সেন: তুমি মাসিমার খেয়াল রেখো... আর মেসোমশাই, ওনাকে একটু বিশ্রাম করতে হবে যে...
আপনিও বরং একটু বিশ্রাম করে আসুন... ধকল তো আপনারও কম যাচ্ছে না! এই বয়সে একটু
নিজের দিকেও খেয়াল নিন, নাইতো আপনার স্ত্রী কে দেখবে কে..
নির্মলাদেবী: শোনো শোনো ...তোমার ডাক্তার
দিদিভাই এর কথা একটু মন দিয়ে শোনো...
অনুব্রতবাবু: আচ্ছা ঠিক আছে...তুমি রেস্ট
নাও... আমি বাইরে আছি। কার একটা ফোন আসছে বাইরে গিয়ে দেখি (বিড়বিড় করে)।
[দৃশ্য ২]
[ফোনে]
অনুব্রতবাবু: হ্যালো!
অপর দিকে: হ্যাঁ হ্যালো, বাপি...
অনুব্রতবাবু: ওঃ অর্ক...
অর্কঃ হ্যাঁ বাপি, বলছিলাম-
অনুব্রতবাবু: তো এই নম্বর টা কবে নিলে?
আমার কাছে নেই তো সেভ করা...
অর্ক: এই ৪-৫ দিন আগে।
অনুব্রতবাবু: আচ্ছা ভাল...তো কি একটা
বলছিলে? ও মায়ের কথা নিশ্চই...
অর্ক: হ্যাঁ মানে ওই-
অনুব্রতবাবু: তোমার মায়ের হার্ট অ্যাটাক
করেছিল শোনার পরেও একটু আসতে পারলে না? নিউ ইয়র্কে এতই ব্যাস্ত তুমি তোমার স্ত্রী
সন্তান কে নিয়ে যে নিজের জন্মদাত্রি মাকে দেখতে আসতে পারো না?
অর্ক: আসলে একটু কাজে-
অনুব্রতবাবু: ছাড়ো, নিজের মা কে একবার চোখের দেখা দেখতেও ইচ্ছে করে না! আমার কথা না হয়,
ছেড়েই দিলাম, কিন্তু যে তোমার জন্যে দিন রাত কেঁদে কেঁদে- উফ- অকৃতজ্ঞ!
অর্ক: প্রত্যেকেরই সংসার আছে...আর এদিকে এত ব্যাস্ততার জীবন, আসবো বললেই আসা যায়
না... এ তোমার ইন্ডিয়া নয়...
অনুব্রতবাবু: থাক! থামো, তোমার কাছ থেকে
এর বেশি আর কিই বা আশা করা যায়। মনে রেখো, নিজের মাকে আজ তুমি- হ্যাঁ তুমি, এই
অবস্থায় ঠেলে দিয়েছো...
অর্ক: আমি? মটেই নয়... ডোন্ট অ্যাকিউজ মি বাবা! জাস্ট ডোন্ট!
অনুব্রতবাবু: সাট আপ! অবশ্যই তুমি... গত
বারোটা বছর তুমি দেশে ফেরনি! বিয়ে করলে ওখানে, আমাদের একবার জানালে না! নিজের
সন্তানকে নিয়ে নিজের দাদু দিদার কাছে এলে না একবারও। তোমার চিন্তায় চিন্তায় আজ
নির্মলার এই অবস্থা...নাঃ একদম না, তোমায় আমি কখনই ক্ষমা করতে পারব না!
অর্ক: শোনো- আমার একটা আর্জেন্ট টক আছে তোমার সাথে, তাই ফোন করা... এই লেকচার আমায়
দিও না...
অনুব্রতবাবু: অসভ্য জানোয়ার! কোনো ইচ্ছাই
নেই আমার তোমার সাথে কথা বলার... রাখছি...
অর্ক: দাঁড়াও এক মিনিট- আ-
অনুব্রতবাবু: হে ভগবান! কি পাপে এই
শাস্তি!ভাল হয়েছি ফোনটা কেটে দিয়ে। গাছের যদি শিকড় ছিঁড়ে যায়, সে কি ভবিষ্যতে ফুল
ফলে ভরে উঠতে পারে? জানি না... পারলে ভাল...
ডঃ সেন: মেসোমশাই?
অনুব্রতবাবু: ওঃ হ্যাঁ, বলুন- মানে বল-
ডঃ সেন: হা হা, আপনি না! এনিওয়ে, বলছি আপনার স্ত্রীর বিপদ এখনও পুরোপুরি কাটেনি।
সত্যি কথা বলতে, এখনও বিপদ আছে। নিয়মিত পরিচর্যা, সময় মতন ওষুধ আর এসব কেসে সব
থেকে যেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ কোনো রকম টেনশন না দেওয়া- এগুলো একটু খেয়াল রাখবেন।
অনুব্রতবাবু: আচ্ছা। নিশ্চয়ই। তাহলে
বলছেন এখনও ভয় কাটেনি?
ডঃ সেন: না না, দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই তবে কি জানেন তো ষাট পেরলেই শরীরটা আর আপনার
বসে থাকে না, আপনাকেই ওর বসে থাকতে হয়। যাইহোক যেগুলো বললাম ওগুলি মাথায় রাখবেন
তাহলে হেসে খেলে আপনাদের পার্টনারশিপ আরও কিছু কাল নিঃসন্দেহে চলবে।
অনুব্রতবাবু: অনেক ধন্যবাদ...
ডঃ সেন: না না, ওই উপড়ে যিনি বসে আছেন, ধন্যবাদটা ওনার প্রাপ্য। যে অবস্থায় ওনাকে আনা
হয়েছিল, সতি কথা বলতে আমিও...(একটু চুপ করে) যাকগে, সে কথা আর ভেবে লাভ নেই...
অনুব্রতবাবু: হ্যাঁ... সেটাই... আচ্ছা
বলছিলাম আর কতদিন থাকতে হবে ওকে এখানে?
ডঃ সেন: থাকুন না আর দিন সাতেক, বিশ্বাস রাখুন ভালই থাকবেন... তারপর না হয় নিয়ে
যাবেন...
অনুব্রতবাবু: আচ্ছা... ঠিক আছে।
ডঃ সেন: আমি এবার যাই, ওই ১৭ নম্বর বেডের রুগীটি আনস্টেবেল কান্ডিশানে আছেন...
অনুব্রতবাব: হ্যাঁ হ্যাঁ যাও...
নমস্কার...
ডঃ সেন: নমস্কার!
অনুব্রতবাবু: যাই, ওই গাছের নিচে বাঁধানো
জায়গাটায় বসে একটু খোলা হাওয়ায় শ্বাস নিয়ে আসি।
[দৃশ্য ৩]
[অনুব্রতবাবু গাছের নিচে একটি বাঁধানো জায়গায় বসে
বসে, চিন্তামগ্ন হন]
অনুব্রতবাবু: অর্ক তো ছোটবেলায় এমন
ছিলনা! কি করে এমন হলো! কোথাও কি ভুল হয়ে গেছে খুব? ভাল বাবা হতে পেরেছিলাম আমি?
নির্মলা তো ভাল মা হতে পেরেছে, নিশ্চয়ই পেরেছে... আমিই কি তবে?
অচেনা ব্যক্তি: একটু বসতে পারি?...দাদা...
শুনছেন...
অনুব্রতবাবু: হ্যাঁ? ও হ্যাঁ হ্যাঁ বসুন
বসুন...
অচেনা ব্যক্তি: এই বুড়ো বয়েসে আর এত ধকল
সহ্য হয়? বিরাশিতে এসে ঠেকলাম...
অনুব্রতবাবু: এখানে কি কেউ ভর্তি আছেন
আপনার?
অচেনা ব্যক্তি: হ্যাঁ, আমার ছেলে... কিডনির
সমস্যা... সে বাড়াবাড়ি শুনেই ছুটে এসেছি সেই আনন্দলোক থেকে... সে অনেক দূরে বুঝলেন তো...
অনুব্রতবাবু: না মানে, ঠিক বুঝলাম না।
আনন্দলোক কি? মানে কোথায় সেটি?
অচেনা ব্যক্তি: জানেন না? ওই বৃদ্ধাশ্রম
একটা...
অনুব্রতবাবু: বৃদ্ধাশ্রম! মানে আপনার
বৃদ্ধাশ্রম আছে? না আপনি বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন? এই যে বললেন ছেলেকে নিয়ে এসেছেন...
অচেনা ব্যক্তি: আরে না না...হে হে...আমার
বৃদ্ধাশ্রম নেই, আমিই থাকি ওখানে। ছেলে অসুস্থ তাই...
অনুব্রতবাবু: কিছু মনে করবেন না... যে
ছেলে আপনাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাল তার জন্যে আপনি এই বয়সে এই শরীর নিয়ে ছুটোছুটি
করছেন? কি করে পারছেন? এই অকৃতজ্ঞরা কি আদৌ এর যোগ্য?
অচেনা ব্যক্তি: ছেলে আমায় ছেড়ে দিয়েছে...কিন্তু
আমি তো আর সেটা পারিনা... আমার রক্তেই তো তৈরি। বলেছিল আমি সংসারের বোঝা, তাই আমার
জন্যে বৃদ্ধাশ্রমটাই মঙ্গলের... খুব কষ্ট হয়েছিল, মনে হয়েছিল, বেঁচে থেকে মরে
গেলাম। শুধু- শুধু প্রাণটাই যা বেরনো বাঁকি। আগে যখন রোজগার করতাম- আমি মুল্যবান
ছিলাম, কিন্তু এখন!...আসলে কি জানেনতো, রোজগারহীন হলেন মানেই আপনি অবাঞ্ছিত।
মৃত্যুই একমাত্র পরিণতি।
অনুব্রতবাবু: আমি হয়তো বুঝতে পারছি আপনার
কষ্টটা...
অচেনা ব্যক্তি: পারছেন? ভাল তবে...
অনুব্রতবাবু: আচ্ছা যাইহোক, আমি অনুব্রত
সান্যাল...
অচেনা ব্যক্তি: নমস্কার, আমি কমলেন্দু দত্ত...
যাকগে, এবার যাই... দেখি... ও-ওদিকে আবার কোনো- আসি হ্যাঁ?
অনুব্রতবাবু: হ্যাঁ আসুন আসুন...
অনুব্রতবাবু: লোকটা কি বললেন! কি নাম!
কমলেন্দু! আমার বাবার নামও যে তাই... হে ঈশ্বর! কি মস্ত বড় ভুল করেছি আমি! ভুল নয়
পাপ করেছি বড়... আজ আমার নিজের ছেলে যখন বুকে ছুড়ি বসাচ্ছে তখন রাগ করছি ওর উপর?
ছিঃ ছিঃ সেই ছুড়িটা যে আমিই তুলে দিয়েছি ওকে... আজ থেকে বছর ত্রিশ আগে, মায়ের
মৃত্যুর পর এক সময় যখন আমার বাবা অসুস্থ হলো খুব, সহ্য করতে পারিনি। রাত দিন সেবা
করা আমার পক্ষে অসম্ভব ছিল। নির্মলাও সহ্য করতে পারতো না। সেই বৃদ্ধ পিতার ওজন
বইতে পারিনি সেদিন। ওই বৃদ্ধ ব্যক্তির ছেলের মতন আমিও নিজের জন্মদাতাকে ত্যাগ
করেছিলাম। একটু সেরে উঠতেই, বাধ্য করেছিলাম বৃদ্ধাশ্রমে যেতে। মনে আছে সেদিন
পাগলের মতন- কেঁদেছিল অর্ক, বারবার বলেছিল “বাপি দাদু কোথায় গেল? দাদুকে এনে
দাও...আমার ব্যাঙ রাজকুমারের গল্পটা শেষ হয়নি!” আমি... কি নিষ্ঠুর! সেই গল্পটা আজ
অর্কের জীবনে অসম্পূর্ণ হয়ে রয়ে গেছে... আমার কারনেই। দোষ আমারই- যে অন্যায় আমি
করেছি এ তারই ফল... স্বার্থপর তো আমি! অকৃতজ্ঞ আমি! এর প্রায়শ্চিত্ত করতেই হতো...
কি জানি হয়তো এখনও বাঁকি আছে প্রায়শ্চিত্ত করা!
[অনুব্রতবাবুর ফোনটা আবার বেজে ওঠে]
অনুব্রতবাবু: আবার একটা অচেনা নম্বর!...
হ্যালো?
অপর দিকে: আমি জানতাম, তুমি আমার ফোন ধরবে না তাই আবার অন্য একটা নম্বর থেকে ফোন করতে
হলো...
অনুব্রতবাবু: অর্ক- বাবা- আমি যে-
অর্ক: লিসেন লিসেন, আই অ্যাম ভেরি বিজি... একটা কথা বলার ছিল তাই, এনিওয়ে আমি
ভাবছিলাম এখানে একটা বিজনেজ স্টার্ট করব... কিছু ইনভেস্টমেন্ট হলে ভাল হয়। তবে
চিন্তা করো না, তোমার কাছে চাইছি না। আমার যেটা অর্জিত, প্রাপ্য সেটাই নেব...
অনুব্রতবাবু: কি বলতে চাও?
অর্ক: মায়ের একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে গত বেশ কয়েক বছর ধরে বেশ কিছু জমেছে... ওই
অ্যাকাউন্টের নমিনি যতদূর জানি আমি নিজে... তো যদি সামনের মাসে সেটি তুলতে পারি...
অনুব্রতবাবু: অর্ক!
অর্ক: দেখো... ইউ নিড টু বি প্র্যাক্টিকাল... সবাই জানি যে কি ঘটতে চলেছে... আর
তোমাদের বউমাও সেটাই চায়... এই ব্যাপারটা মিটলে আমার এদিকেও সুবিধা হয়...সো-
অনুব্রতবাবু: ঈশ্বর! তুমি কি আয়না ধরছ!
আর যে পারছি না... অর্ক, তোমার মা এখনো বেঁচে- সেই আশা তোমার এখুনি পূরণ হবেনা। আর
কয়েকটা বছর অপেক্ষা করো... তারপর এসে নিয়ে যেও- শুধু একটি কথা, মনে রেখো, ভগবান সব
দেখছেন- আর আজ যা তুমি করছ তোমার আরালে হয়তো আর একজন শিখছে এই একই জিনিস তোমার
ঘরে...ঠিক যেমন তুমি শিখেছ আমার থেকে! নাঃ দোষ তোমায় দেবো না... এযে আমারই
পাপ...আমার অন্যায়ের প্রতিফলন। যাইহোক এখন রাখো ফোনটা, তুমি যেদিন সুসংবাদটা পাবে,
সেদিন এসে নিয়ে যেও টাকাগুলো! ভাল থেকো... রাখলাম!
অনুব্রতবাবু: আজ আয়নায় নিজের চিত্রটা
দেখে বড্ড ভয় লাগছে! নিজেকে মানুষ ভেবে ভুল বুঝেছি এতদিন... এ ফল যে পেতেই
হতো।যাকগে... যাই... উঠি-, অনেক শুদ্ধ বাতাস পেয়েছি, দেখি গিয়ে বুড়িটাকে-
[দৃশ্য ৪]
[রুমে ঢুকতেই]
নিলা: আপনাকেই খুঁজছিলেন... নির্মলাদেবী- আপনার হাসবেন্ড এসেছেন-
নির্মলাদেবী: আরে- এ- এদিকে শোনো, কথা
আছে...
অনুব্রতবাবু: বল-
নির্মলাদেবী: বলছিলাম ভগবান যা করেন
মঙ্গলের জন্যেই করেন।
অনুব্রতবাবু: হঠাৎ এই কথা-
নির্মলাদেবী: তুমি- তুমি- কিসসু বঝোনা!
এই শরীর খারাপ হয়ে ভালই হলো, এবার দেখবে অর্ক আসবে- দাদুভাই আসবে- বউমা আসবে-
অনুব্রতবাবু: কিন্তু-
নির্মলাদেবী: কি কিন্তু?
অনুব্রতবাবু: না, কিছু না।
নির্মলাদেবী: উফ, কি যে বল ব্যাঙ,
কি-কিছুই বুঝি না-
অনুব্রতবাবু: আরে অত কথা বলছ কেন!
বিশ্রাম নাও না...
নির্মলাদেবী: সে হবে খন, আগে তুমি অর্ককে
ফোন করো-
অনুব্রতবাবু: ও করেছিল, কথা হয়েছে।
নির্মলাদেবী: কি? অর্ক ফোন করেছিল? নিজে
থেকে? আর সে কথা তুমি এতক্ষন বলনি! কি মানুষ তুমি!
অনুব্রতবাবু: নির্মলা একটু ঘুমিয়ে নাও
প্লিজ।
নির্মলাদেবী: মানে! তোমার কি মাথা খারাপ?
আগে বল ও কি বলল- এতদিন তো ছেলেটা কে সহ্য করতে পারতে না। বলতে মা বাবা কে ভুলে
গেছে, এখন দেখো, একটু শরীর খারাপ হতেই কেমন সারাদিন মায়ের চিন্তায় ব্যাস্ত হয়ে
উঠেছে! আর বলবে ওসব কথা?
অনুব্রতবাবু: আচ্ছা বলব না। ঘুমাও এখন।
নির্মলাদেবী: আরে আশ্চর্য! কি ঘুমাও
ঘুমাও করছ! আগে বল ও কি বলল- কবে আসবে?
অনুব্রতবাবু: আসবে না এখন।
নির্মলাদেবী: আসবে না! মানে! মিথ্যে বলছ
তুমি- অর্ক আসবে না বলেছে?
অনুব্রতবাবু: না মানে, এখন আসবে না, পরে
আসবে।
নির্মলাদেবী: পরে?
অনুব্রতবাবু: হ্যাঁ মানে, ডঃ সেন বললেন
তুমি সুস্থ, তাই এক সপ্তাহের মধ্যেই ছেড়ে দেবেন তোমায়। তাই আমি ওকে সুখবর টা দিতেই
ছেলের সে কি আনন্দ... তো- তো আমি বললাম বাড়ি ফিরলে আসতে...আসলে, আসলে ওর কি একটা
কাজ আছে, সে সব ফেলেই চলে আসছিল, তো- তো মানে ভাবলাম যে, ঠিক যখন হয়ে গেছো ঠাকুর
ঠাকুর করে, তাহলে ও- ও- কিছুদিন পরেই আসুক ওর কাজ মিটিয়ে-
নির্মলাদেবী: ও, বুঝেছি। বাঃ খুব ভাল
করেছ। ঠিক ঠিক, মাকে এই অবস্থায় এখানে দেখলে ও বেচারা সহ্য করতে পারত না। এত
ভালবাসে মা কে। মনে আছে সে একবার স্কুল থেকে ফিরে আমার চোখে জল দেখে সে ছেলের কি
কান্না! বোকা বুঝতেই পারেনি, আমি পেঁয়াজ কাটছিলাম! মায়ের কষ্ট একদম সহ্য করতে পারে
না যে...
অনুব্রতবাবু: হ্যাঁ, জানি তো সোনা, আমিই
ভুল বুঝেছি ওকে, সব দোষ আমার-
নির্মলাদেবী: বাহ, হে হে! তাহলে স্বীকার
করলে- আর এটাও নিশ্চয়ই বুঝলে যে এতদিন কেন আসেনি?
অনুব্রতবাবু: কেন?
নির্মলাদেবী: আরে অনেক কাজ তো ওখানে- ও
কি আর এ দেশ! আমেরিকা! বাব্বা কত বড় দেশ! সবাই ছুটছে- আমাদেরও বোঝা উচিত ওর দিকটা-
অনুব্রতবাবু: তুমি বুঝেছ?
নির্মলাদেবী: বুঝেছিই ত...আমি তোমার মতন
বুদ্ধু নাকি! হা হা
অনুব্রতবাবু: বাঃ তাহলে তো বেশ!
নির্মলাদেবী: আচ্ছা শোনো, বাড়ি গিয়ে ঘর
দোর গুছাতে হবে, আর হ্যাঁ, ওই ড্রেসিং টেবিলের আয়না টা পাল্টে দেব, ওটা ভেঙ্গে
গেছে- ইশ ছেলে বউমা এসে ভাঙ্গা আয়নায় মুখ দেখবে নাকি!
অনুব্রতবাবু: কি বললে! আয়না!
নির্মলাদেবী: হ্যাঁ- কেন! কি হলো! তোমার
গা কাঁপছে কেন! কি গো? এই তুমি কি কাঁদছ? আরে কাঁদছ কেন! আমি তো ঠিক আছি- এই-
অনুব্রতবাবু: আমি- আমি একটু বাইরে আছি, আসছি-
নির্মলাদেবী: আরে! কি রে বাবা! ফোনটা তো
নিয়ে যাও- ওই দেখ চলে গেল, পাগল একটা...সেরে গেছি তাও- আরে এবার দেখ দেখি! ফোন
আসছে- এ কিরকম নম্বর! নাম নেই!
নীলা: না না আপনি ফোন-টোন ধরবেন না, আমায় দিয়ে দিন... একদম নয়-
নির্মলাদেবী: আরে আমি সুস্থ...কিছু হবে
না... দেখি তো কে- ঠিক আছে, আচেনা কেউ যদি হয়, আগে আমি কথা বলব না-
নীলা: কিন্তু-
নির্মলাদেবী: চুপ চুপ-
[ফোনে]
অপর দিকে: হ্যালো বাপি, আগের বার লাইনটা শেষের দিকে ডিস্টার্ব করছিল তাই ঠিক মতন শুনতে
পেলাম না, বলছি খবরটা আমায় জানিও দেন আমি সেই মতন গিয়ে নমিনি হিসাবে ব্যাঙ্ক থেকে
টাকাটাও তুলে আনব আর এক বারে ক্রিয়াকর্ম কিসব আছে সেগুলোও-
নির্মলাদেবী: বাবু!
অর্ক: মা! মানে- তু- তুমি
নীলা: নির্মলাদেবী! ও কি! আপনার কি হয়েছে আবার? কষ্ট হচ্ছে! ফোনটা রাখুন, ডঃ সেন-
অনুব্রতবাবু-
অনুব্রতবাবু: কি হয়েছে! এত চেঁচামেচি!
আরে- নির্মলা! নির্মলা- কি হয়েছে- আরে হলো টা কি!
নির্মলাদেবী: আ- আমি- আর- বুকের- মাঝখান- উফ! মাঃ
অনুব্রতবাবু: মানে? কি করে? কি করে হঠাৎ!
নীলা: আসলে উনি ফোনটা!
অনুব্রতবাবু: ফোন! কি! ওঃ গড! হ্যালো-
অর্ক: বাপি সরি, আমি বুঝতে পারিনি-
অনুব্রতবাবু: অসভ্য জানোয়ার, রাখ ফোনটা-
ডঃ সেন-
ডঃ সেন: কি হয়েছে টা কি! এত চিৎকার- আরে! মাসীমা! নীলা শীগগির আক্সিজেন মাস্ক দাও,
মেসমশাই সরে দাঁড়ান-
নির্মলাদেবী: বুকটা- ফে- ফেটে-
ডঃ সেন: এই তো এই তো মাসীমা কিচ্ছু হবে না, আমি আছি-
নির্মলাদেবী: অ- অর্ক- অর্ক- আ- আসছে
নাঃ...
ডঃ সেন: ওঃ কি হলো... মাসীমা- মাসীমা-
অনুব্রতবাবু: নি- নি- নির্মলা!
ডঃ সেন: নো- নো- নো! হাউ ইস দিস পসিবেল! নীলা! মেসোমশাই কিভাবে!
অনুব্রতবাবু: এ আমার- আমার প্রায়শ্চিত্ত!
ডঃ সেন: কি! মানে! আমি- আমি- আই অ্যাম রি- রিয়েলি সরি মেসোমশাই!
অনুব্রতবাবু: কেঁদো না! তোমার কিছু-
তোমার কিছু করার ছিল না! তুমি একটা হেল্প করবে আমায়?
ডঃ সেন: মেসোমশাই-
অনুব্রতবাবু: আমার ক্ষমতা হবে না! আমি
একটা নম্বর ডায়েল করে দিচ্ছি, তুমি- তুমি শুধু তাঁকে বলে দাও- সূর্যাস্ত হয়েছে, সে
এবার আসতে পারে-
যবনিকা পতন!
অভিষেক ঘোষ

Comments
Post a Comment